শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

কোটা থেকে বিপ্লব

সামছুল আরেফীন

হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ৫ আগস্ট দেশ ফ্যাসিবাদ মুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ লড়াই চূড়ান্ত রূপ লাভ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। শিক্ষার্থীদের ৩৬ দিনব্যাপী আন্দোলনে যুক্ত হয় সর্বস্তরের জনতা। দেশ থেকে পালিয়ে যায় ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এবারের আন্দোলন ছিল দ্বিতীয় দফা আন্দোলন। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু প্রথম দফার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন। ওই বছরের ৪ অক্টোবর কোটা প্রথা বাতিল প্রসঙ্গে পরিপত্র জারি করে সরকার।

দ্বিতীয় দফা আন্দোলন শুরু হয়েছিল চলতি বছরের পয়লা জুলাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা বাতিলের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে ছাত্রসমাবেশ ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের à§« জুন সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত ও আধাস্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (নবম থেকে ১৩তম গ্রেড) মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন আদালত। এর পরদিন পরিপত্র বাতিলের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বিক্ষোভ সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। মূলত এ দিনেই কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের দ্বিতীয় দফা আন্দোলনের বীজ বপন হয়। 

ঈদের ছুটির পর শিক্ষার্থীরা আবারও আন্দোলনে নামেন। একইসঙ্গে বিগত সরকারকে স্মারকলিপি প্রদানসহ কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনে নানা মাত্রা যোগ করেন। à§­ জুলাই শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ নামে অভিনব কর্মসূচি শুরু করলে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। এসময় তারা চার দফা থেকে সরে এসে নির্বাহী বিভাগের কাছে কোটা সংস্কার করে সংসদে আইন পাশের একদফা দাবি জানান। ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। প্রতিদিন à§«-৬ ঘণ্টা অচল হয়ে পড়ে রাজধানী।

আপিল বিভাগে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার বিষয়ে শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল ৪ জুলাই। তবে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগ ‘নট টুডে’ বলে আদেশ দেন। পরের সপ্তাহে এ বিষয়ে শুনানি হতে পারে বলে ওই দিন অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয় থেকে জানানো হয়। এদিন শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধ করে। আর ঢাকায় শাহবাগ মোড় অবরোধ করে রাখে পাঁচ ঘণ্টা। এদিন ছাত্রসমাবেশ থেকে ছাত্রধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়।

৬ জুলাই সব বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন, ছাত্রধর্মঘট এবং সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধের ডাক দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয় ‘বাংলা ব্লকেড’। এদিন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ ও অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়।

à§® জুলাই ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ প্ল্যাটফরম ৬৫ সদস্যের সমন্বয়ক টিম গঠন করে। সমন্বয়ক কমিটির সদস্য নাহিদ ইসলাম সরকারি চাকরিতে সব গ্রেডে অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে শুধু সংবিধান অনুযায়ী অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যূনতম কোটা রেখে সংসদে আইন পাসের দাবি জানান। এদিন ঢাকার ১১টি স্থানে, ৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ে, তিনটি স্থানে রেলপথ অবরোধ এবং ছয়টি মহাসড়কে বাংলা ব্লকেড কর্মসূচি পালিত হয়।

১৪ জুলাই, জাতীয় সংসদে জরুরি অধিবেশন ডেকে সরকারি চাকরির সব গ্রেডের কোটার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে সরকারকে ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান করে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা। এদিন গণভবনে চীন সফর উপলক্ষে আয়োজিত সাংবাদিক  সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না? তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা চাকরি পাবে?’ আন্দোলনকারীরা এই মন্তব্যকে তাদের জন্য অবমাননাকর মনে করে রাতে ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, চট্টগ্রাম ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সেসব মিছিলে শিক্ষার্থীরা স্লোগান দেয় : ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার/কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’ কিংবা ‘চাইতে গেলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’। ২০১৮ সালের আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, সে সময় তিনি বিরক্ত হয়ে কোটা বাতিল করে দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল কোটা বাতিল হলে কী হয় সেটি দেখা। এই সময়ে বিসিএসে নারীরা বাদ পড়েছেন, ২৩টি জেলার কেউ পুলিশে চাকরি পাননি।

à§§à§« জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, নিজেদের রাজাকার বলতে তাদের লজ্জাও লাগে না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ স্লোগানের জবাব ছাত্রলীগই দেবে বলে মন্তব্য করেন। এর পর দুপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাঁরা ‘আমি রাজাকার’ স্লোগান দিচ্ছেন, তাঁদের শেষ দেখিয়ে ছাড়বেন বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন। বিকেল ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আন্দোলনকারীদের মারধর করা হয়। গুলি করতেও দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা হয়। আহত ২৯৭ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। হামলার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা ১৬ জুলাই বিকেল ৩টায় সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

আগের দিন বিভিন্ন শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগের হামলার ফলে বিক্ষোভ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। দিনভর দেশজুড়ে চলে ব্যাপক বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ। আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট ও ছররা গুলি নিক্ষেপ করে। আর ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র এবং পিস্তল-বন্দুক নিয়ে হামলা করে। এতে নিহত হন ছয়জন, এর মধ্যে চট্টগ্রামে তিনজন, ঢাকায় দুজন এবং রংপুরে একজন। সরকার বিকেলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রংপুর ও রাজশাহীতে বিজিবি মোতায়েন করে। রাতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। মধ্যরাতে বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইল (ফোরজি) নেটওয়ার্ক।

১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে প্রথম শহীদ হন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দুই হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকা নিরস্ত্র সাইদের বুকে গুলি করে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন ভিন্ন মোড় নেয়। বিশ্বময় আন্দোলনের প্রতীক হয়ে উঠেন আবু সাঈদ। 

à§§à§® জুলাই সকাল থেকেই দেশব্যাপী প্রতিরোধ, সহিংসতা, সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীদের সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ সারা দেশ ছিল প্রায় অচল। রাজধানী ছাড়াও দেশের ৪৭টি জেলায় দিনভর বিক্ষোভ, অবরোধ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, পুলিশের হামলা-গুলি ও সংঘাতে বাড়তে থাকে নিহতের সংখ্যা। অন্তত ৪১ জন নিহতের খবর পাওয়া যায় এদিন। আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তিদের মধ্যেও বাড়তে থাকে নিহতের সংখ্যা। ‘শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব ও সোয়াটের ন্যক্কারজনক হামলা, খুনের প্রতিবাদ, খুনিদের বিচার, সন্ত্রাসমুক্ত ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা এবং কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে’ কমপ্লিট শাটডাউন বা সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। সারা দেশে বিজিবি মোতায়েন করা হয়।

১৯ জুলাই, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা সর্বাত্মক অবরোধের কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, গুলি, অগ্নিসংযোগ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এদিন আরো বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটে। এদিন অন্তত à§­à§« জন নিহতের খবর পাওয়া যায়। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের 

পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় জনসাধারণ ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। রাত সাড়ে ৯টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের গণমাধ্যমে পাঠানো বার্তায় ৯ দফা দাবিতে কমপ্লিট শাটডাউন চলমান থাকার কথা জানান। এভাবে প্রতিনিয়ত মানুষ হত্যা, নির্যাতন বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে আন্দোলনের গতি। 

এর মধ্যে সমন্বয়কদের দফায় দফায় তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ডিবি হেফাজতে নিয়ে আন্দোলন বন্ধের ঘোষণা দেয়ার নাটকে সাজানো হয়। তারপরও এগিয়ে যেতে থাকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন। 

২৯ জুলাই, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত ১৪ দলের বৈঠকে। ৬ সমন্বয়ক ডিবি হেফাজতে। ‘জাতিকে নিয়ে মসকরা কইরেন না’, এক শুনানিতে এই মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘কথিত আটক’ ছয়জন সমন্বয়ককে অবিলম্বে মুক্তি দিতে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালাতে নির্দেশনা চেয়ে করা রিটের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের উদ্দেশে হাইকোর্ট এই মন্তব্য করেন। শুনানির এক পর্যায়ে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদী হাছান চৌধুরী বলেন, ‘গতকাল টিভিতে দেখেছি, এই ছয়জন (সমন্বয়ক) কাঁটাচামচ দিয়ে খাচ্ছে।’ এক পর্যায়ে আদালত বলেন, ‘এগুলো করতে আপনাকে কে বলেছে? কেন করলেন এগুলো? জাতিকে নিয়ে মসকরা কইরেন না। যাকে নেন ধরে, একটি খাবার টেবিলে বসিয়ে দেন।’

ছয় সমম্বয়কের অনুপস্থিতিতে আব্দুল কাদেরসহ আব্দুল হান্নান মাসউদ, মাহিন সরকার ও রিফাত রশীদ আন্দোলনের হাল ধরেন। কর্মসূচি ঘোষণা দিয়ে তারা আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এদিকে অনশনের মুখে ছয় সমম্বয়ককে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ডিবি।

à§©à§§ জুলাই, মার্চ ফর জাস্টিস কর্মসূচির পর নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ। এই দিনের কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’। সন্ধ্যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহসমন্বয়ক রিফাত রশিদের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। 

à§§ আগস্ট গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। দুপুর দেড়টার একটু পরেই তারা ডিবি কার্যালয় থেকে কালো রঙের একটি গাড়িতে বেরিয়ে আসেন। রাতে ছাড়া পাওয়া অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলমের ফেসবুক স্ট্যাটাস। তিনি লিখেছেন, ‘ছয় দিনের ডিবি হেফাজত দিয়ে ছয়জনকে আটকে রাখা যায়, কিন্তু এই বাংলাদেশের পুরো তরুণ প্রজন্মকে কিভাবে আটকে রাখবেন? দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছেন প্রতিনিয়ত, সেগুলো কিভাবে নিবৃত্ত করবেন?’ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার।

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে নাহিদ ইসলাম এক দফা ঘোষণা করেন। তবে মাঠে আসার আগেও এক দফা ঘোষণার বিষয়টি চূড়ান্ত ছিল না বলে জানান আব্দুল কাদের। তিনি বলেন, মাঠ এক দফার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তত ছিল। সিনিয়ররা মাঠে এসে যখন পরিস্থিতি দেখলেন, তখন তারা এক দফা ঘোষণা করলেন। অবশ্য আমরা আগে থেকেই তাদেরকে একদফা ঘোষণার চাপ দিয়ে আসছিলাম। কারণ মানুষের জীবন নিয়ে আমরা নিরীক্ষা চালাতে পারি না।

৬ আগস্টের ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি à§« আগস্ট এগিয়ে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, জ্যৈষ্ঠ সমম্বয়করা বুঝে-শুনে এগোতে চাইছিলেন। কিন্তু মাঠের অবস্থা দেখে আমরা শেখ হাসিনাকে সময় দিতে রাজি ছিলাম না। লং মার্চ এগিয়ে আনতে আমি চাপ দিলাম। কারও কারও সঙ্গে বাক যুদ্ধও হলো। শেষে আসিফ ভাইয়েরা লংমার্চ এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেকারণে শেখ হাসিনা সময় পাননি।

৩ আগস্ট ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের আলোচনার প্রস্তাব দেন। তবে দুপুরে কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের নেই। রাজধানীর আফতাবনগরের ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা। রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাজারখানেক শিক্ষার্থী সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মিছিল বের করে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) সামনে জড়ো হয়ে স্লোগান দেয়। এদিন শিক্ষার্থীরা এক দফা, এক দাবি নিয়ে মাঠে নামে। তারা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর ধানম-ির রবীন্দ্রসরোবরে সংগীতশিল্পীদের প্রতিবাদী সমাবেশ হয়। বিকেল ৪টার পর বিক্ষুব্ধ জনতা বিরাট মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে যাত্রা শুরু করে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ একত্র হয়। বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে শহীদ মিনারে সমবেত ছাত্র-জনতার উদ্দেশে বক্তব্য দেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠনটির সমন্বয়ক মো. নাহিদ ইসলাম।

৪ আগস্ট অসহযোগ আন্দোলনকে ঘিরে এদিন অনেক জেলায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, সংঘর্ষ এবং গোলাগুলির ঘটনা ঘটে, এতে ৯৮ জন সাধারণ মানুষ ও পুলিশ নিহত হয়। লক্ষ্মীপুরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এক কলেজছাত্র। আহত হয় অর্ধশতাধিক মানুষ। সকাল ১১টার দিকে জেলা শহরের উত্তর তেমুহনী থেকে ঝুমুর পর্যন্ত এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়াও সারা দেশের মধ্যে সংঘর্ষে সিরাজগঞ্জে পুলিশের ১৩ সদস্যসহ ২২ জন, রাজধানীতে ১১, ফেনীতে আট, লক্ষ্মীপুরে আট, নরসিংদীতে ছয়, সিলেটে পাঁচ, কিশোরগঞ্জে পাঁচ, বগুড়ায় পাঁচ, মাগুরায় চার, রংপুরে চার, পাবনায় তিন, মুন্সীগঞ্জে তিন, কুমিল্লায় পুলিশের সদস্যসহ তিন, শেরপুরে দুই, জয়পুরহাটে দুই, ভোলায় এক, হবিগঞ্জে এক, ঢাকার কেরানীগঞ্জে এক, সাভারে এক, বরিশালে এক, কক্সবাজারে এক ও গাজীপুরের শ্রীপুরে একজন নিহত হয়েছেন।

à§« আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে অভুতপূর্ব একটি দিন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তন করে ৬ আগস্টের পরিবর্তে à§« আগস্ট সোমবার এ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ। এতে সারা দেশ থেকে আন্দোলনকারীদের ঢাকায় আসার আহ্বান জানানো হয়। ফ্যাসিষ্ট শেখ হাসিনা দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে বাংলাদেশ ছাড়েন। তাঁর বোন শেখ রেহানার সঙ্গে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে দেশত্যাগ করেন। শেখ হাসিনা যাওয়ার আগে একটি ভাষণ রেকর্ড করে যেতে চেয়েছিলেন। তিনি সে সুযোগ পাননি। ওই হেলিকপ্টারটি ভারতে অবতরণ করে। এ সময় গণভবনে অসংখ্য মানুষ ঢুকে পড়ে। বাংলাদেশে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস বলেন, à§« আগস্ট সকালে আমার বাসার সামনে দেখি একদল মারকুটে চেহারার লোক। তার আগে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হয়। বুকের ভেতর তখন ক্ষোভ এত তীব্র যে কিছুই আর তোয়াক্কার সময় ও ইচ্ছাÑকোনোটাই ছিল না। পালিয়ে সেন্ট্রাল রোড দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে আসছিলাম। হঠাৎ রাস্তায় দেখি আলোকচিত্রী শহিদুল আলম ভাই আর নৃবিজ্ঞানী রেহনুমা আহমেদ আপা। তারাও ছোট মিছিল নিয়ে এগোচ্ছিলেন। উদ্দেশ্য শাহবাগ। আমাকে তাঁরা নিজদের মাঝখানে রেখে এগোতে লাগলেন। বেশ ভরসা পেয়েছিলাম। বেলা দেড়টার দিকে খবর এল, শেখ হাসিনা পালিয়েছেন। মুহূর্তে বদলে গেল সব। à§§à§« বছর ধরে কষ্ট করছি। বাবাকে জেলে নিল, ছাত্রদের ওপর আক্রমণ হলো। দেড় হাজার ছাত্র-জনতা হত্যার শিকার হলো। আহত ও পঙ্গু ২০ হাজার। শেখ হাসিনার বিদায়ে সেদিন মানুষের মধ্যে কী যে আনন্দ! আমরা শাহবাগে গেলাম। মানুষ আমাদের চিনতে পারছিল। কেউ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করছে, ফুলের তোড়া দিচ্ছে কেউ। পুরো বাংলাদেশ তখন ফ্যাসিবাদী সরকারের নাগপাশ থেকে মুক্তির আনন্দে উদ্বেল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ